১৯৭৫ সালের এপ্রিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবুকার্কি শহরে দুজন তরুণ একটি অফিস ভাড়া নিয়েছেন। একজনের বয়স ২২, অন্যজনের ১৯। শহরের এমআইটিএস নামের ছোট এক ইলেকট্রনিকস কোম্পানি তখন বাজারে এনেছে ‘আলতাইর ৮৮০০’ নামের একটি কিট-কম্পিউটার, যা শখের প্রযুক্তিবিদেরা নিজেরাই জোড়া লাগিয়ে নিতেন। ওই যন্ত্রের জন্য বেসিক নামের প্রোগ্রামিং ভাষা লিখে দিয়েছেন এই দুজন। নিজেদের নতুন কোম্পানির নাম রেখেছেন ‘মাইক্রো-সফট’। মাইক্রোকম্পিউটারের সফটওয়্যার, এই অর্থে।
বয়সে ছোটজনের নাম উইলিয়াম হেনরি গেটস, সবাই ডাকে বিল। বড়জন পল অ্যালেন। তখন তাঁদের কোম্পানিতে লোকজন হাতে গোনা, আয়ও সামান্য। অথচ পরের কয়েক দশকে সেই কোম্পানির তৈরি সফটওয়্যার বিশ্বের কোটি কোটি ডেস্কে বসে যাবে, আর বিল গেটস বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় বছরের পর বছর জায়গা করে নেবেন।
গেটসের গল্প বলতে গেলে প্রথমেই ‘ড্রপআউট’ শব্দটা চলে আসে। হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ছেড়ে দিয়ে একজন বিশ্ব জয় করেছেন, এই কাহিনি তরুণদের কাছে আকর্ষণীয়। তবে পুরো ছবিটা আরেকটু জটিল। গেটস পড়া ছেড়েছিলেন বটে, কিন্তু তা নিতান্ত অনিশ্চয়তায় ঝাঁপ দেওয়া ছিল না। শৈশব থেকেই তিনি এমন পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে কম্পিউটারের সামনে বসার সুযোগ ছিল বিরল, আর পেছনে ছিল সচ্ছল একটি পরিবার।
যে স্কুলের টার্মিনাল বদলে দিল জীবন
বিল গেটসের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৮ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটল শহরে। বাবা উইলিয়াম গেটস সিনিয়র ছিলেন আইনজীবী, মা মেরি গেটস শিক্ষক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। ব্রিটানিকার জীবনীতে বলা হয়েছে, ছোটবেলা থেকেই গেটস ছিলেন অসম্ভব মেধাবী আর প্রতিযোগিতাপ্রিয়, পড়াশোনায় এগিয়ে থাকলেও নিজের পছন্দের বিষয় ছাড়া অন্য কিছুতে মন বসত না।
মোড় ঘুরল ১৩ বছর বয়সে, যখন তাঁকে সিয়াটলের বেসরকারি লেকসাইড স্কুলে ভর্তি করানো হয়। ষাটের দশকের শেষ দিকে সেখানে স্কুলের অভিভাবকদের একটি সংগঠন বিক্রির টাকা দিয়ে একটি টেলিটাইপ টার্মিনাল কিনেছিল, যার মাধ্যমে টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে দূরের একটি মেইনফ্রেম কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত। তখনকার দিনে কম্পিউটার ছিল দামি জিনিস, আর স্কুলপড়ুয়া কারও পক্ষে তা পাওয়া প্রায় অকল্পনীয়। গেটস আর তাঁর কয়েকজন সহপাঠী সেই টার্মিনালে এমনভাবে আটকে গেলেন যে ক্লাসের বাইরের প্রায় পুরো সময়টাই কাটত তার সামনে।
এই বন্ধুদের একজন ছিলেন দুই বছরের বড় পল অ্যালেন। দুজনের বন্ধুত্ব, প্রোগ্রামিংয়ে একসঙ্গে ডুবে থাকা আর পরে একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করার সূত্রটা এখান থেকেই। স্কুলের পাট চুকতে না চুকতেই তাঁরা ‘ট্রাফ-ও-ডেটা’ নামের একটি ছোট উদ্যোগ দাঁড় করান, যেটি সড়কের যানবাহনের তথ্য বিশ্লেষণের যন্ত্র বানাত। ব্যবসা তেমন চলেনি, কিন্তু মাইক্রোপ্রসেসর নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা জমা হয়েছিল।
স্টাডি ডটকমে গেটসের বায়োগ্রাফিতে এ সময়ের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে স্পষ্ট, তাঁর কম্পিউটারপ্রীতি কোনো আকস্মিক খেয়াল ছিল না। সুযোগ পাওয়ার পর তিনি তা আঁকড়ে ধরেছিলেন, আর সেই আঁকড়ে ধরার ক্ষমতাই তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করেছিল।
একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ, একটি দুঃসাহসী ফোন
১৯৭৩ সালে গেটস ভর্তি হন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে আইনে পড়ুক। কিন্তু গেটসের মন পড়ে থাকত বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবে। হার্ভার্ডে তাঁর হলের সঙ্গী ছিলেন স্টিভ বালমার, যিনি পরে মাইক্রোসফটের দীর্ঘদিনের প্রধান নির্বাহী হন।


