Copyright: Any unauthorized use or reproduction of The Daily Star content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
একবার ভাবুন, একজন নারী সদ্য তোলা চা-পাতায় বোঝাই একটি ভারী ঝুঁড়ির ভারে নুয়ে পড়েছেন। তার পা ভেজা, পিঠে টান আর কোমল কুঁড়ি ও কচি পাতার ফাঁকে দ্রুততার সঙ্গে চলছে তার হাত। দিন শেষে যে মজুরি তিনি পাবেন, তা দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোও প্রায় অসম্ভব। চা-বাগানের লেবার লাইনে তার ঠাঁই একটি ছোট্ট ঘরে। যে জমির ওপর তার ঘর সেই জমির মালিকানাও তার নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই চা-বাগানে বসবাস এবং কাজ করে আসছে তার পরিবার। অথচ বাগানের মালিকানা, ভালোমন্দ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াসহ সবকিছু থেকেই তারা বঞ্চিত।
এটিই বাংলাদেশের চা-শিল্পের মানবিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। চা-বাগানের সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর বৈষম্যে জর্জরিত এক আর্থসামাজিক ব্যবস্থা।
ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতার অবনতি এবং রপ্তানি আয় হ্রাসের প্রেক্ষাপটে সরকার চা-শিল্পের পুনর্গঠনে একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে গঠিত টাস্কফোর্স এ খাতের সংস্কারের লক্ষ্যে ৫৯টি সুপারিশ পেশ করে। এর মধ্যে রয়েছে চা-কে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, ভ্যাট হ্রাস, ঋণ পুনর্গঠন, কারখানার আধুনিকায়ন এবং ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার একটি সহায়তা তহবিল গঠন। পরবর্তী সময়ে সংস্কার কার্যক্রম তদারকির জন্য বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের পরিবীক্ষণ ও পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়।
চা শিল্পের গভীর সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়। নিষ্ক্রিয় বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো: এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কাদের স্বার্থে হচ্ছে? এর সুফল যদি কেবল বাগানমালিক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বাংলাদেশ সরকার এমন এক শিল্পকে সংকট থেকে উদ্ধারের ঝুঁকি নেবে, অথচ উপেক্ষিত থেকে যাবেন সেই মানুষগুলো, যাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রমের ওপর ভর করেই এই শিল্প টিকে আছে।
চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করা, শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন এবং জমির আনুষ্ঠানিক স্বত্ব নিশ্চিত করার দাবিতে এ বছরের জুলাই ও আগস্টে এক মাসের বেশি সময় ধরে চা শ্রমিকদের আন্দোলন হয়। এই আন্দোলন আবারও চা-শিল্পের দীর্ঘদিনের সংকট এবং শ্রমিকদের বঞ্চনার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।
এর আগে, ২০২৪ সালে, রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) ১২টি চা-বাগানের ১২ হাজারেরও বেশি শ্রমিক মজুরি নিয়ে কয়েক সপ্তাহের জন্য অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ফুলতলা চা-বাগানের প্রায় ১ হাজার ৬০০ শ্রমিক টানা ১২ সপ্তাহ মজুরি পায়নি এবং হবিগঞ্জের ইমাম ও বাওয়ানি চা-বাগানেও ২০২৩ সাল থেকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থাপনা সংকট চলছিল। গোটা শিল্পে ৭৯টি চা-বাগান গভীর সংকটের মধ্যে ছিল বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এসব বাগানে ভবিষ্যৎ তহবিলে (প্রভিডেন্ট ফান্ড) শ্রমিকদের প্রাপ্য অর্থ জমা দেওয়া হয়নি, পানি ও বিদ্যুতের মতো জরুরি পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, আর কারখানাগুলোতেও স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না।রাষ্ট্রের ৫১ শতাংশ শেয়ার মালিকানা থাকা ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে, কীভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব একটি প্রতিষ্ঠানকে পঙ্গু করে দিতে পারে। তবে সংকট কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত চা-বাগানেই সীমাবদ্ধ নেই। বছরের পর বছর ধরে ব্যক্তিমালিকানাধীন চা-বাগানগুলোতেও অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
চা-শিল্পে সংকটের জন্য মালিকপক্ষ সাধারণত চায়ের দাম কমে যাওয়া ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করে। এটা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়; কিন্তু একই পরিস্থিতিতেও কেন কিছু চা-বাগান ভালোভাবে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে, আর কিছু চা বাগান কেন বছরের পর বছর উৎপাদনশীলতার সংকটে ভুগছে, তার ব্যাখ্যা মালিকরা দিতে পারেন না।
এক্ষেত্রে, মৌলভীবাজার জেলার ইস্পাহানি’র জেরিন চা-বাগান একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। বাগানটিতে একরপ্রতি চায়ের গড় উৎপাদন জাতীয় উৎপাদনের প্রায় দ্বিগুণ। একইসঙ্গে, সেখানকার শ্রমিকেরা তুলনামূলকভাবে উন্নত আবাসন, কর্মপরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট: উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য নয়। বরং, সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ দুটিই অর্জন করা সম্ভব।
টাস্কফোর্স এবং পরবর্তীকালে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক এবং চা শিল্পের প্রতিনিধিরা স্থান পেয়েছেন। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় চা শ্রমিকদের কিংবা তাদের ট্রেড ইউনিয়নের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।


