প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
রুম নম্বর ৪০০৫। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আমার নতুন ঠিকানা। তখনো প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা হয়নি। কোভিডের কারণে সব এলোমেলো চলছে। মনের ভেতরে সদ্য বাড়ি ছেড়ে আসার দগদগে ক্ষত। তবু দুই মাস ১৬ জনের রুমে কাটানোর পর ৪০০৫ একটু স্বস্তি দিচ্ছিল। চার বেডে ৮ জন। প্রত্যেকেই আলাদা জেলার মানুষ।
রুমের সিনিয়র আপুদের তথাকথিত নিয়মকানুন বুঝে না উঠতেই অদ্ভুত এক ভুল করে বসলাম। পত্রিকা ভুল। আমি অনুমতি না নিয়ে রুমে একটা পত্রিকা কিনে ফেলেছি। আর সবাইকে বলেছি, কেউ নিয়মিত পত্রিকা নিতে চাইলে আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারে। ব্যস! আমি আর তাঁদের বোঝাতেই পারলাম না যে ফ্লোরে দাদু এসেছিল, হঠাৎ সিদ্ধান্তে আমি পত্রিকা নিয়েছি। তাঁরা একই কথা আওড়াতে থাকলেন, মিটিং না করে, সবাইকে না জানিয়ে কেন নিয়মিত পত্রিকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
আমি আহাম্মক বনে গেলাম। আমার বাড়িতে আমার জন্মের আগে প্রথম আলো ঢুকে পড়েছে। আমি ঘুম থেকে ওঠার আগেই পত্রিকা এসে টেবিলের ওপর সদর্প জায়গা করে নেয়। ঠিক যেন বাড়ির আর দশটা আসবাব কিংবা কাঁথা–বালিশের মতো। আলাদা করে চিন্তা করে দেখিইনি, পত্রিকা কোত্থেকে আসে, কেন আসে, বিল কত। সেই আমার মাথায় কীভাবে আসবে যে একটা পত্রিকা কেনার জন্য মিটিং করতে হবে?
মনটা ভেঙে গিয়েছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ আমার দৈনন্দিন জীবনের কোনো অভ্যাস কিংবা অধিকারে হস্তক্ষেপ করে ফেলেছে। সেদিন প্রথম আবিষ্কার করলাম, আমার জীবনের প্রতিটি বাঁকে কীভাবে জড়িয়ে রয়েছে একটা দৈনিক সংবাদপত্র।
গোল্লাছুটের পাতায় গোল হয়ে ঘুরতে থাকা চোখ দুটো এখন ছুটে বেড়ায় সম্পাদকীয় পাতা থেকে অভিমত-বিশ্লেষণ, সাহিত্য পাতা থেকে কখনো অর্থনীতির পাতায়। অনলাইনে মতামত বিভাগে প্রথমবার নিজের লেখা কলাম দেখে খুশি হওয়ার চেয়ে প্রশ্নই বেশি জেগেছে মনে, প্রথম আলোর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও কি ফেলে এলাম আমার শৈশব-কৈশোরের সময়গুলো?
৪০০৫–এ আমি ১০ মাস ছিলাম। পুরো সময়ে পত্রিকা ভুলের ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে বারবার৷ তাঁদের অনেকের কাছে পত্রিকা শুধু রিডিং রুমে অনাদরে পড়ে থাকা চাকরির পরীক্ষার রসকষহীন এক তথ্যভান্ডার। আমি কীভাবে বোঝাতাম, এই খসখস শব্দে পাতা ওলটানোর আওয়াজ সারা দেশের অসংখ্য মানুষের কাছে সকালবেলার অভ্যাস।
প্রথম আলো যখন ১৮–তে পা রাখল, আমার বয়স তখন ১৫। মফস্সল শহরের এক বালিকা মাইক্রোফোন হাতে দৃঢ়কণ্ঠে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শুরু করল, ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। সেই থেকে আমার উপস্থাপনার যাত্রা শুরু হলো প্রথম আলোর সঙ্গে। তারপর কত আয়োজন পার হলো। আমি প্রতিনিয়ত বৈচিত্র্য শিখেই যাচ্ছি; কতভাবে কথা বলা যায়, কতভাবে লেখা যায়।
হল ছাড়ার পর আমি চলে গেলাম রাজবাড়ীর বেড়াডাঙায়। সেখানে আমাদের দুই সদস্যের নতুন সংসার। মফস্সল শহর হিসেবে জায়গাটা বেশ পছন্দ হলো আমার। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা নদী। সব গুছিয়ে নেওয়ার পর অনেক কষ্টে একজন হকারকে খুঁজে পাওয়া গেল। তিনি শর্ত দিলেন, শহরের বিভিন্ন অফিসে পত্রিকা দিয়ে সবশেষে এসে দুপুর ১২টায় পত্রিকা দিয়ে যাবেন। প্রথম দিন পত্রিকা ফেলে কলবেল চেপে তিনি চলে গেলেন। আমি ১০ মিনিট পরে পাঁচতলা থেকে নেমে দেখি, পত্রিকা নেই। পরপর তিন দিন একই ঘটনা। রাগ হলো ভীষণ।
ভাবলাম, বাড়ির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিযোগ করি। পরে পরিকল্পনা পরিবর্তন করলাম। খুব বিনয়ের সঙ্গে লেখা হলো, ‘সিঁড়িরুম থেকে রোজ একটা প্রথম আলো পত্রিকা মিসিং হচ্ছে। মূল দরজার তালা ভুলবশত খোলা থাকায় বাইরের মানুষ হয়তো ঢুকে পড়ছে। আমরা বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আগামীকাল একই ঘটনা ঘটলে সিসিটিভি চেক করা উচিত।’
পরদিন থেকে পত্রিকা এক ফোঁটাও নড়েনি। আমার জায়গায় বাবা থাকলে বলতেন, দরকার নেই খুঁজতে যাওয়ার। কেউ অন্তত পড়ছে! আমি তাঁর মতো অতটা উদার হতে পারিনি।
সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে যারা পাঠক ও পাঠক নই, সবাই-ই কোনো খবর কোথাও দেখলে সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য এখন পর্যন্ত প্রথম আলোতেই ঢুঁ মারি। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় আছে, ‘আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে অবিশ্রান্ত’। প্রথম আলোর ১৮ পেরিয়ে ২৮ হয়ে গেল। তবু আঘাতের শেষ নেই। আগুনের মুখে দাঁড়িয়ে ফিনিক্স পাখি হয়ে জেগে উঠতে হয় বারবার। এভাবেই প্রথম আলো পাঠকের হোক, তবে তার চেয়ে বেশি হোক মানুষের।

